আমাদের মাঝে কিছু ধর্ম বিষয়ের পণ্ডিত গদগদ হয়ে বলেন যে, অন্য ধর্মের মহাপুরুষেরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে মহানবির আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন!
এই প্রমাণটিকে জলজ্যান্ত সত্যরূপে দাঁড় করানো হয় দলিল দিয়ে। কয়েক হাজার বছর আগে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ এবং মুনি-ঋষিদের বাণীগুলোকে দলিলরূপে দাঁড় করানোর জন্য হুবহু তুলে ধরতে দেখা যায়।তাছাড়া ভগবান কৃষ্ণ, জয়ব মুনি এমন কি গৌতমবুদ্ধের কথাগুলোকে বাণীরূপে তুলে ধরেন। এতে কী প্রমাণিত হয়? বিজ্ঞানী নিউটনের ক্রিয়া এবং উল্টা প্রতিক্রিয়া নামক সূত্রটি মনে পড়ে। এরা কাজটাকে তুলে ধরেন কিন্তু উল্টা কাজটার কথা ভুলে যান। মহানবির আগমনের সুসংবাদটি তুলে ধরার আগে এটুকু চিন্তা করেন না যে, যিনি বা যারা এরকম কথা বলতে পারেন তাঁরাও মহাপুরুষ। তাঁরাও এলমে গায়েব জানতেন। তা না হলে কেমন করে মহানবির আগমনের কথাটি বলতে পারলেন?
জয়ব মুনির তো মহানবির বাবার নাম, কোন যুদ্ধে দাঁত শহিদ হবে, কপাল বেয়ে রক্ত গড়াবে ইত্যাদি বর্ণনাগুলো পড়লে চমকে যেতে হয়। অবশ্য প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় বর্ণনাটি পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো যে, যে-সব মহাপুরুষ এরকম কথা বলে গেছেন তাঁরা এলমে গায়েব জানতেন। যাঁরা এলমে গায়েব জানেন তাঁরা হয় নবি-রসুল, নয়তো আল্লাহর ওলি। কোরান-এর সুরা ইব্রাহিমে তো বলেই দেওয়া হয়েছে, প্রত্যেক জাতি এবং সম্প্রদায়ের নিকট সেই জাতি এবং সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষায় রসুল পাঠানো হয়েছে আল্লাহর নিদর্শনগুলো বর্ণনা করার জন্য। অথচ এরা মহাপুরুষদের বাণীগুলোকে দলিলরূপে একদিকে গ্রহণ করেন আবার ঠিক অন্যদিকে মহাপুরুষদের ফেলে দেন। কাঁধের উপর বাপ-দাদার পাওয়া সাইনবোর্ডটি সাংঘাতিক শক্তিশালী। পারমাণবিক বোমার শক্তি এই কাঁধের সাইনবোর্ডের সামনে পটকা ফুটানোর মতো। কেবল শব্দই তুলতে পারে কিন্তু বাপ-দাদার দেওয়া সাইনবোর্ডে আঁচড়ও লাগে না। এটা কেবল আমাদের বেলাও যেমন খাটে না, তেমনি যারা সুসংবাদটি দিয়ে গেলেন তাদের অনুসারীদের বেলায়ও খাটে না। বাপ-দাদা হতে পাওয়া কাঁধের সাইনবোর্ডটি ফেলে দেওয়া বড়ই কষ্টকর। মৃত্যুর পরও যে সাইনবোর্ডটি থেকে যায় তা দেখতে পাই গোরস্থান, সেমিট্রির ক্রুশ আর শ্মশানে। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির পীরবাবা শামস-ই তাববিজ উলঙ্গ সুফিবাদের উলঙ্গ রচনা দিওয়ানে শামস ই ভাববিজ-এ এরকম রহস্যময় কথা বলে গেছেন।
হায় আফসোস! আমাদের পোড়া কপাল! আজও এই দিওয়ানটি বাংলায় কেউ অনুবাদ করেননি। কারণ সবটুকু অনুবাদ করতে গেলে কয়েক খণ্ডের বিরাট আকার ধারণ করবে। অনুবাদ করলেও এত টাকা খরচ করে ছাপাবে কারা এবং ছাপানো হলেও কিনে নেবেই বা কারা? আর সুফিবাদের এমন প্রেমিক কমই আছে যারা কিছু ত্যাগ করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু সুফিবাদটি তুলে ধরার জন্য সামান্য একটু এগিয়ে এলেই অন্ধ চোখগুলো যে কিছুটা খুলে যাবার রাস্তা তৈরি করে রাখা হবে। এতে সবাই সুফিবাদের রাস্তা দিয়ে হেঁটে না গেলেও কিছু লোক তো অবশ্যই হাঁটতে চাইবে। আর এখানেই তো সার্থকতা।
গ্রন্থ: মারেফতের গোপনেরও গোপন কথা (পৃষ্ঠা: ৩৭-৩৮)
চেরাগে জান শরিফ বিনয়ের সম্রাট ডা. কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর বা-ইমান আল সুরেশ্বরী।

Post a Comment